Homeইতিহাসজুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা

২০২৪ সালের আগস্ট মাস একটু দেরিতে এসেছিল। প্রথম পাঁচটি দিন ঘুমিয়ে ছিল জুলাইয়ের পেটের ভেতর। আগস্টের পাঁচ দিন পেটে নিয়ে জুলাই স্ফীত হয়েছিল ৩৬ দিনে এবং জন্ম দিয়েছিল এক নতুন বাংলাদেশের। কী সেই নতুন বাংলাদেশ? কেমন ছিল এর স্বরূপ? আজ দুই বছর পর সেই বাংলাদেশের সঠিক মুখাবয়বটি ভালো করে চিনে নেওয়ার সময় এসেছে।
ইতিহাসপড়ুন
বিজ্ঞাপন
কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন নাহিদ ইসলামের ঘোষণায় এক দফার আন্দোলনে পৌঁছে গেল এবং সেই ঘোষণা অনুযায়ী পতন ঘটল ১৭ বছরের এক দানবীয় অপশক্তির, মানুষ ভাবল, এটাই জুলাই। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিল, এরপর কী? আবার তারাই স্বগতোক্তির মতো বলেছিল, যা খুশি তাই হোক, অন্তত রাক্ষসী হাসিনার কাছ থেকে তো দেশ মুক্ত হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ ভেবেছিল, হাসিনার পতনই জুলাইয়ের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা। কিছুদিন পরে হাসিনা-ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা এইটুকুও বলতে নারাজ। তারা বলতে লাগল, জুলাই ছিল চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলন, ব্যস, এর বেশি কিছু নয়। আমেরিকানরা টাকা দিয়ে এনজিওগুলোকে মাঠে নামিয়েছে হাসিনার পতন ঘটানোর জন্য। টাকা, ক্ষমতা, বুলেট—সবই তো হাসিনার ছিল। সে কি পেরেছিল মানুষকে নিবৃত্ত করতে? পারেনি। সারা দেশের মানুষ একটি আকাঙ্ক্ষা বুকে ধারণ করে চব্বিশের জুলাইয়ে নেমে এসেছিল রাজপথে। এমন স্বতঃস্ফূর্ত জনস্রোত টাকা কেন, কোনো কিছু দিয়েই তৈরি করা যায় না। ছেলেকে পুলিশ গাড়িতে তুলছে, মা তার পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে—টাকা দিয়ে কোনো মাকে এই উচ্চতায় তোলা যায় না। হাজার হাজার মা রাস্তায় নেমে এসে পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের মুখে পানি, ফলের রস, নুডলস তুলে দিচ্ছেন। কেউ টাকা দিয়ে এমন একটা দৃশ্য আবার তৈরি করতে পারবে?
সবাই একটি আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাসিনার পতন ঘটাতে নেমে এসেছিল—আর যেন কেউ এ দেশে হাসিনা হতে না পারে। মানুষ অর্ধশতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা হাসিনা-ব্যবস্থা থেকে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষা বুকে ধারণ করে, মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে, নেমে এসেছিল রাজপথে। শুধু শেখ হাসিনার পতন নয়, জুলাই একটি বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার নাম। সেই আকাঙ্ক্ষাটিই আমাদের ভালো করে বুঝতে হবে।
৩৬ দিনের জুলাই ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে যে নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, সেই বাংলাদেশ শুধু হাসিনামুক্ত বাংলাদেশ নয়; সেই বাংলাদেশ সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। যেখানে মানুষ মূল্যায়িত হবে তার মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য জন্মাতে হবে না জিয়া বা মুজিব পরিবারে। কৃষক-শ্রমিকের সন্তান, যদি তার মেধা থাকে, যোগ্যতা থাকে, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা থাকে, সেই হবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এই বাংলাদেশেরই বিভাষ রচনা করেছে জুলাই। একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্নই জুলাই। জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নামের মধ্যেই নিহিত আছে ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা।
ইতিহাসপড়ুন
একটি সমাজের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা কখনো অনৈতিক হয় না। ব্যক্তিগতভাবে মানুষ অসৎ হয়, কোনো কোনো সমাজের সব নেতৃত্ব অসৎ মানুষদের কাছে চলে যায়। এই অসৎ ব্যক্তিদের প্রভাবে সমাজ কলুষিত হয়। তখন দেখে মনে হয়, এই সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু সেই নষ্ট সমাজের ভেতরে লুকোনো একটি যৌথ আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন থাকে, যা কখনোই নষ্ট নয়। সেই আকাঙ্ক্ষাটি একটি সুন্দর, শুদ্ধ ও নৈতিক সমাজেরÑযেখানে কেউ কারো চেয়ে বড় নয়, কেউ কারো চেয়ে ছোট নয়

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments